বাঁশতলা সাব-সেক্টর



বর্তমান সুনামগঞ্জ জেলার ছাতক, দোয়ারা বাজার এবং জগন্নাথপুর উপজেলা নিয়ে ছিলো বাঁশতলা সাব-সেক্টরের সীমানা। সিলেট সুনামগঞ্জ মহাসড়কের উত্তরদিকে অবস্থিত- শিল্পশহর বলে খ্যাত ছাতকে ছিলো তৎকালীন পূর্বপাকিস্তানের প্রধান শিল্প প্রতিষ্ঠান ছাতক সিমেন্ট কোম্পানী, দোয়ারা বাজারের টেংরাটিলা গ্যাস ফিল্ড থেকে এখানে গ্যাস সরবরাহ হতো। ফলে সীমান্তবর্তী ছাতক দোয়ারা’র নিয়ন্ত্রন নেয়া পাকিস্তান সেনাবাহিনীর জন্য গুরুত্বপুর্ণ ছিলো। এ ছাড়া জগন্নাথপুর গুরুত্বপুর্ণ ছিলো প্রবাসী অধ্যুষিত অঞ্চল হিসেবে।

১৯৭০ এর নির্বাচনে ছাতক-দোয়ারা থেকে নির্বাচিত এম এন এ আব্দুল হক এবং এমপিএ শামছু মিয়া চৌধুরীকে উপদেষ্টা করে ২৬ মার্চের আগেই এখানে সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়। পরিষদের সভাপতি ছিলেন মদরিছ চৌধুরী ( সভাপতি আওয়ামী লীগ), সম্পাদক মদরিচ আলী বিএ ( ন্যাপ সভাপতি) সহ সম্পাদক মানিক মিয়া ( ন্যাপ সম্পাদক)। ২৬ মার্চ ঢাকায় গনহত্যা শুরু হলে সর্বস্তরের জনগনকে নিয়ে সংগ্রাম পরিষদ তাদের কর্মকৌশল নির্ধারন করে- এ অঞ্চলকে স্বাধীন রাখা। স্থানীয় আনসার-মুজাহিদদের সংগঠিত করে প্রশিক্ষনের উদ্যোগ নেয়া হয়। আসন্ন আক্রমনকে ঠেকানোর জন্য প্রশিক্ষনের অস্ত্র সরবরাহের উদ্দেশ্যে এপ্রিলের প্রথম দিকে এম এন এ আব্দুল হক ও মদরিছ আলী বিএ সীমান্তের ওপারে চলে যান। সেখানে প্রাথমিক যোগাযোগের পর ছাতকে ফিরে না এসে তারা সীমান্তের বুড়িঢর গ্রামে অবস্থান করে কার্যক্রম চালান। ২৮ এপ্রিল সকালে সংগ্রাম পরিষদের সভা চলাকালীন সময় খবর আসে যে সিলেটের দিক থেকে শত শত পাক সেনা রাস্তার দু পাশের ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে এবং মানুষজনকে হত্যা করে এগিয়ে আসছে। বাংগালী আনসার মুজাহিদ ও ইপিআর’রা রেলস্টেশন থেকে প্রতিরোধ করার চেষ্টা করেন কিন্তু আধুনিক অস্ত্রসজ্জিত বিপুল সংখ্যক সেনার মোকাবেলায় তা যথেষ্ট ছিলোনা। সংগ্রাম কমিটির কর্মীরা সহ হাজার হাজার সাধারন মানুষ সীমান্তের দিকে ছুটতে থাকেন প্রাণভয়ে আর শুরু হয় পাকবাহিনীর ধ্বংস ও হত্যাযজ্ঞ। সংগ্রাম পরিষদের নেতৃবৃন্দ ভোলাগঞ্জে জড়িত হন। মানিক মিয়া ও মদরিছ আলী শিলং যান, সেখানে এম এন এ আব্দুল হক এ অঞ্চলের অন্যান্য নেতৃবৃন্দ দেওয়ান ফরিদ গাজী, পীর হাবিবুর রহমান, দেওয়ান ওবায়দুর রেজা, বরূন রায় প্রমুখ তখন ভারতীয়দের সাথে আলাপ আলোচনা ও অস্ত্র সংগ্রহের তৎপর ছিলেন। শিলং থেকে দিক নির্দেশনা পেয়ে মানিক মিয়া ও মদরিছ আলী ভোলাগঞ্জ ফিরে এসে তাদের কর্মতৎপরতা শুরু করেন। ভোলাগঞ্জের বাংলাদেশ অংশে রাখা হয় মুক্তিযুদ্ধে যোগদান ইচ্ছুক যুবকদের জায়গা আর ভারতীয় অংশে মুল ক্যাম্প। ভোলাগঞ্জের ডিংরাই নামক স্থানে ইয়ুথ ক্যাম্প চালু করা হয়- মুক্তিযোদ্ধাদের ভর্তি ও প্রশিক্ষনের জন্য। ক্যাম্পের প্রশাসক ছিলেন ভারতিয় ফ্লাইট ল্যাফটেন্যান্ট (অব) এনসি বসাক এবং বাংলাদেশের পক্ষে ক্যাম্প ইনচার্জ মানিক মিয়া। সিলেটো ছাতকের বহু মানুষ বাঁশতলা ক্যাম্পে আশ্রয় নিয়েছিলেন। হেমেন্দ্র চন্দ্র পুরকায়স্থ দিনরাত পরিশ্রম করেছিলেন এ ক্যাম্পের জন্য।

পার্শ্ববর্তী দোয়ারাবাজারে ও আওয়ামী লীগ নেতা একেএম আসকির মিয়াকে সভাপতি করে সংগ্রাম কমিটি গঠিত হয়। কমিটি অন্যান্য সদস্যরা ছিলেন আহসান উল্লাহ, সিরাজ মিয়া, মদনমোহন নন্দী, উবেদ আলী মোড়ল, ডাঃ আব্দুল হামিদ। মুক্তিযুদ্ধের প্রথম প্রহরেই স্থানীয় আয়োজনে দোয়ারাবাজারে শুরু হয়ে যায় প্রতিরোধ যুদ্ধ । টেংরাটিলা গ্যাস ফিল্ডে ছিলো পাকিস্তানীদের শক্তিশালী ঘাঁটি। হরিনাপার্টি গ্রামের ছাত্রনেতা শহীদ চৌধুরী স্থানীয় আনসার মুজাহিদ ও ইপিআরদের সংগঠিত করে প্রতিরোধযুদ্ধ শুরু করেন। রেঙ্গুয়া গ্রামে হেডকোয়ার্টার স্থাপন করে তারা পাকিস্তানী আর্মিদের উপর চোরাগোপ্তা হামলা করতে থাকেন নিয়মিত।

সিলেট সুনামগঞ্জ মহাসড়কের দক্ষিন দিকে প্রবাসী অধ্যুষিত জগ্ননাথপুর থানায় সংগ্রাম কমিটি গঠিত হয় নির্বাচিত এমপিএ আব্দুর রইছের সভাপতিত্বে। কমিটির অন্যান্যরা ছিলেন সুধীরচন্দ্র গোপ, হারুনুর রশীদ, সৈয়দ ফখরুল ইসলাম, সৈয়দ খালিক মিয়া, বুলবুল আহমদ, বশির মিয়া, জব্বার মিয়া প্রমুখ। এ অঞ্চল থেকে নির্বাচিত এমএনএ আব্দুস সামাদ আজাদ কেন্দ্রীয় নেতা হিসেবে যুদ্ধকালীন প্রবাসী সরকারের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে সক্রিয় ছিলেন।
যুদ্ধকালীন বাংলাদেশ সরকারের কেন্দ্রীয় পরিকল্পনামতো জুলাই মাসে সারাদেশকে ১১টি সেক্টরে ভাগ করা হলে উত্তর সিলেট ও সুনামগঞ্জ নিয়ে গঠিত ৫ নং সেক্টরের সামরিক কমান্ডার হিসেবে দায়িত্বপ্রাপ্ত হন মেজর মীর শওকত আলী। এই সেক্টরের বেসামরিক উপদেষ্টা ছিলেন নির্বাচিত এমএনএ ও এমপিএগন। ৫ নং সেক্টরের বাঁশতলা সাব-সেক্টরের দায়িত্ব গ্রহন করেন পাকিস্তানের শিয়ালকোট থেকে পালিয়ে আসা তরুন অফিসার ক্যাপ্টেন হেলাল জুলাই মাসের শেষের দিকে। প্রাথমিকভাবে শহীদ চৌধুরীর হেডকোয়ার্টার রেঙ্গুয়াতেই তার সাব-সেক্টর রাখলে ও পরে আরো দুর্গম পাহাড় জঙ্গল ঘেরা বাঁশতলাতে সাব-সেক্টর হেডকোয়ার্টার হিসেবে গড়ে তোলেন। শহীদ চৌধুরীর দলটিকে ও তিনি তার সাব-সেক্টরের অঙ্গীভূত করেন। পরে তার সহযোগী হিসেবে যোগ দেন লেঃরউফ ও লেঃ মাহবুব।

ছাতক দখলের যুদ্ধে জেডফোর্সের থার্ড বেঙ্গল রেজিমেন্ট স্পেশাল ফোর্স হিসেবে ১৩ অক্টোবর থেকে এখানে যুদ্ধ করে।

৩ ডিসেম্বর পর্যন্ত এ সাব-সেক্টরে মুক্তিযোদ্ধা ও অস্ত্রশস্ত্র ছিলোঃ এম এফ ( নিয়মিত বাহিনী) ৯৬ জন , এফ এফ ( অনিয়মিত বাহিনী- ছাত্র, কৃষক, রাজণৈতিক কর্মী) ১৪২০ জন। ৩০৩ রাইফেল ৪৬৪টি, ৭.৬২ রাইফেল ৩৫০টি, ৩০৩ এল এম জি ৩১টি, ৭.৬২ এল এম জি ২৪টি, ৯ এম এম স্টেন ২৭১টি, জি এফ রাইফেল নয়তি, ২ ইঞ্চি মর্টার তিনটি, তিন ইঞ্চি মর্টার দুটি, ৭৩-৮৩ এম এম লিরেট একটি, শটগান তিনটি এবং স্টিম প্রজেক্টর দুটি। বাঁশতলা ( সেলা) সাব-সেক্টরের উল্লেখযোগ্য যুদ্ধ ও প্রতিরোধগুলো হলোঃ- লক্ষীপুরের যুদ্ধ, সুলতানপুরের যুদ্ধ, বেতুরার দালাল ফকির চেয়ারম্যানের বাড়িতে পাকসেনা ক্যাম্প আক্রমন, চড় বাড়ুকার শান্তি কমিটির চেয়ারম্যানের বাড়ি আক্রমন, টেংরা টিলার গ্যাস পাইপলাইন ধ্বংস, মাছিমপুর গ্যাস পাইপ লাইন ধ্বংস, নৈনগাঁও গ্যাস পাইপ লাইন ধ্বংস, নরশিমপুরের যুদ্ধ, সোনাপুরের যুদ্ধ, বালিউরার যুদ্ধ, মহব্বতপুর অপারেশন, ব্রিটিশ সড়কের দখল নিয়ে যুদ্ধ, ছাতক মুক্ত করার যুদ্ধ ডাবর ফেরি ধ্বংস ও জাওয়ার সেতু ধ্বংসের অভিযান, ছাতক সিলেট রাস্তার ঝাওয়া রেল সেতু ও ঝাওয়া সড়ক সেতু ধ্বংস, তেগাঙ্গা নদীতে পাকসেনা হত্যা, পাকিস্তান আর্মির বিভিন্ন বাংলার থেকে বাঙ্গালী নারীডের উদ্ধার, টেংরাটিলা ও দোয়ারাবাজার মুক্ত করার যুদ্ধ।

এই সাব-সেক্টরের তিনজন এফএফ ইদ্রিছ আলী, আব্দুল মজিদ ও আব্দুল হালিম এবং এমএফ ক্যাপ্টেন আকবর বীরপ্রতীক খেতাবে ভূষিত হন। এ ছাড়া সহকারি সাবসেক্টর কমান্ডার লেঃ আব্দুর রউফ বীরবিক্রম খেতাব লাভ করেন। ‘কাঁকন বিবি’ নামে খ্যাত খাসিয়া রমনী কাকেট ও এই সাব-সেক্টরে মুক্তিবাহিনীর হয়ে গুপ্তচরবৃত্তি করেন। যদি ও সাব-সেক্টর সীমানায় অন্তর্ভুক্ত কিন্তু ভৌগোলিক অবস্থানের কারনে জগন্নাথপুর উপজেলায় বাঁশতলা সাব-সেক্টর থেকে অপারেশন করা যায়নি। জুলাই মাসে সালেহ চৌধুরী দিরাই থানার মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে দিরাই থানা দখল করলে ও পরে আবার পাকিস্তানীরা দখল করে নেয়। নৌপথের সুবিধার কারনে জগন্নাথপুর উপজেলায় টেকেরঘাট সাব-সেক্টরের মুক্তিযোদ্ধারা বিশেষ করে বিখ্যাত ‘দাসপার্টি’ এখানে অনেকগুলো অপারেশন চালায়।

বাঁশতলা সাব-সেক্টরের সীমানভুক্ত ছাতক, দোয়ারা ও জগন্নাথপুর উপজেলায় পাকিস্তান আর্মি তাদের স্থানীয় দালালদের সহযোগীতায় ভয়ংকর গনহত্যা, নারী নির্যাতন ও ধ্বংসযজ্ঞ চালায়। ২৮ এপ্রিল পাকিস্তান আর্মি ছাতক শহরে ঢুকেই গুলী করে হত্যা করে আওয়ামী লীগ থেকে নির্বাচিত এমপিএ শমসু মিয়া চৌধুরীর ভাই ও বাবাকে। ছয়দফা ও ‘৭০ এর নির্বাচনে আওয়ামী লীগের পক্ষে প্রচারনা চালানোর অপরাধে হত্যা করে গীতিকবি ওসমান গনিকে। রাজাকার কমান্ডার সাজিদুর রহমান তোতামিয়ার ইন্ধনে তারা হত্যা করে প্রগতিশীল ছাত্রনেতা মখলিছুর রহমানকে। দোয়ারাবাজারের রাজাকার ফকির চেয়ারম্যানের সহযোগীতায় হত্যা করে মুক্তিযুদ্ধগামী সতেরো তরুনকে, নৈনগাঁও গ্রাম জ্বালিয়ে দিয়ে হত্যা করে ৩৫ জন মানুষ, শ্রীপুর গ্রাম তছনছ করে হত্যা করে আরো অসংখ্য মানুষ। টেংরাটিলা সহ আরো বহু জায়গায় চালায় গনহত্যা। জগন্নাথপুরের শ্রীরামসি গ্রামে পাকিস্তানীরা হত্যা করে শতাধিক মানুষ, রানীগঞ্জ বাজারে আক্রমন করে দুই শতাধিক মানুষ হত্যা করে ভাসিয়ে দেয় কুশিয়ারা নদীতে।

ছাতকের উত্তর সীমান্তের দূরবীন টিলা, ফকির টিলা, ইংলিশ টিলা এবং দোয়ারা বাজারের টেংরা টিলায় পাকিস্তান আর্মির বাংকার গুলো হয়ে উঠেছিলো বাঙ্গালী নারীদের বন্দীশালা। বিভিন্ন গ্রামে জ্বালিয়ে দিয়ে নারীদের ধরে এনে এসব বাংকারে আটকে রাখতো পাকিস্তানীরা। মুক্তিযোদ্ধারা এসব বাংকার দখল করে বহু নারীদের উদ্ধার করেন।

দোয়ারাবাজারের মহব্বতপুর এবং ছাতকের হাদা পাণ্ডব গ্রামে যুদ্ধরত অবস্থায় শহিদ হয়েছেন বিপুল সংখ্যক মুক্তিযোদ্ধা। এ ছাড়া বাঁশতলা সাব-সেক্টর হেডকোয়ার্টারে ও রয়েছে শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের কবর।

[ তথ্যসূত্রঃ রক্তাক্ত ৭১ সুনামগঞ্জ, বজলুল মজিদ খসরু]